সাইন্স ল্যাব মোড়েঢাকায় পৌছেছি ১৫ তারিখ ভোরে। প্লেন মাটিতে নামার আগেই টের পেলাম হোম টার্ফে খেলা শুরু হয়ে গেছে। প্লেনে সেলফোন কেন অন করা হল এই নিয়ে দুভদ্রলোক তুমুল তর্ক জুড়ে দিয়েছেন। দু গেলাস রেড ওয়াইন আর তিনটা বিয়ার খেয়ে একটা সুখনিদ্রা দিয়েছিলাম, মহাশয়দের কল্যাণে আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠতে হল।
ঢাকায় ইমিগ্রেশন পার হতে আমার "ব্যাপক" ভয় হয়। সেই ভয়ের পাছায় লাথি মেরে অফিসার ভদ্রলোক আমাকে চটপট ছেড়ে দিলেন। লাগেজ হাতিয়ে যখন বের হলাম, তখন বাবা হাত-পা ছুঁড়ে আমার চোখে পড়ার চেষ্টায় ব্যস্ত।
ঢাকার রাস্তায় তেমন পরিবর্তন নেই। অনেকদিন বড় রাস্তায় নোংরা আর ধূলো দেখিনা বলে কিঞ্চিত ধাক্কা খাওয়াটা স্বাভাবিক, কি আর করা!
এবার শুরু থেকেই আমি ভীষন অর্গানাইজড। পিডিএতে টুডু লিস্টে তোলা সব। তাতে ১ নম্বরে লেখা যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠাকরন আর ০ নম্বরে লেখা এটিএম কার্ড এর কার্যকারিতা নিশ্চিতকরন।
সকাল হতেই, মেব্যাংকের হলুদ কার্ডটা নিয়ে স্ট্যানচার্ডের এটিএম এর লাইনে দাড়ালাম। লম্বা লাইন সেখানে। সে আশায় একখাবলা বালি আর খানিকটা সুরকি ঢেলে কার্ড কাজ করলো না। যেসব কার্ডের পেছনে আর ATM মেশিনে PLUS সাইনটা থাকে তারা একে অপরের সাথে কথা বলতে পারে। মুস্কিল হল স্ট্যানচার্ডের ATM চূড়ান্ত মূক-বধিরের মতো কার্ডটা উগড়ে দিল। ভাগ্যিস HSBC বেশী দূরে ছিল না, শেষ রক্ষা হল সেখানে।
রাইফেলস স্কয়ারে ৩০০ টাকায় GP এর কানেকশন নিয়ে ফেললাম। দেশ অনেক এগিয়ে গেছে, সবাই এখন মোবাইল ডেটা সার্ভিস দেয়। প্রতি কিলোবাইট ডেটা মাত্র ২ পয়সা, আমাকে আর কে পায়! বাংলাদেশের মতো জায়গায় রাস্তাঘাটে নেট পাওয়াটা পরম সৌভাগ্য বলতেই হবে। আমার কাছে মনে হয়েছে এই সুযোগকে ব্যবহার করে অনেক কিছু করে ফেলা সম্ভব, আমার বিশ্বাস অল্প দিনের মধ্যেই আমরা সেই সুফল পেতে শুরু করবো। আরেকটি জিনিস আসলেই উল্লেখ করার মতো, সেটা হল, রাস্তারঘাটে মোবাইল টেলিফোন সার্ভিস বিক্রি করার দোকান। এদের সম্বল একটা সেলফোন আর একটা টুল। মাত্র ৪০০০ টাকা পুঁজিতে একটা মানুষ যদি চাহিদাযুক্ত ব্যবসা শুরু করতে পারে তাহলে তাকে অ্যাপ্রিশিয়েট না করাটা অন্যায় হবে!
বিকেলে আজিজে গেলাম সচল সমাবেশ দেখতে। লাল্লু অমিত (আহমেদ), সুজন অমিত, চোরা বলাই, ডেয়ারিং পিলু ভাই, অমায়িক বিপ্লবদা, ডটু রাসেল, ঝরাপাতা, মেন্টাল, অপালাদি এদের দেখে বুকটা ভরে গেল। এক বছর পর আবার একসাথে হতে পারাটা বড় আনন্দের। আমি আমার ইশকুলের বন্ধুদের সাথেও এভাবে কখনও আলিঙ্গন করা হয় না, টানটা কিভাবে যে এতো আন্তরিক হয় সেটা এক অদ্ভুত রহস্য!!!
নতুন মানুষদের মধ্যে ছিলেন লীলেন ভাই আর মুজিব মেহেদী। বস্তিবাসী লীলেন ভাই চমৎকার লোক, ভারী গলায় আদর করে করে শব্দ উচ্চারন করেন। ফর্সা দিলের এই গুনধর সচলকে গুরু মানতে হবে। মুজিব মেহেদী কথার বলার চেয়ে শোনাতে বিশ্বাসী। অমায়িক এই ভদ্রলোকের সাথে যেটুকু সময় আড্ডা দিলাম তাতে ভালোই লাগলো।
লীলেন ভাই এর ষড়যন্ত্রে আমাকে একটা লেকচার ঝাড়তে হয়েছে। কথা বলার মাঝে খেয়াল করলাম উপস্থিত অনেকের মাঝে কিঞ্চিত অসহায়ত্ব। কবিতার মাঝে ইউনিকোডের প্রসঙ্গ টানাটা কতো বিপদজনক হতে পারে এই প্যাঁচালটা পাড়তে গিয়ে জানা গেল..
সে রাতে সচল ভুড়িভোজটা খাসা হয়েছিল। কি মেনু জানতে চান? চিতল মাছের কোপ্তা, মুরগীর রোস্ট, রুই মাছের পেটি, আচার, ডাল আর সাদা ভাত... সচল সমাবেশ হবে আর তাতে ভুড়িভোজ হবে না তা কি করে হয়!
গতকাল আর আজ বিকেল পর্যন্ত ব্যস্ত ছিলাম গাড়ি ঠিক করতে । বিকেলে পিলু ভাই হাজির, গেলাম আজিজে। রাসেল ভাই ছিলেন সেখানে। দুজনে সচলের টি-শার্ট পরে এসেছিলেন। খুব শখ ছিল রাসেল ভাইকে মডেল বানিয়ে কিছু ছবি তোলার। কিন্তু ওনার ছবি প্রকাশ হলে মার খাবার ব্যাপক সম্ভাবনা আছে, তাই আপাতত ফোটোসেশন হল না।
. পিলু ভাইকে বিশাল ধন্যবাদ, বছর দেড়েক পর গরুর চাপ খেলাম। দুটো চাপ আর আটটা লুচি, উমম!! আরেকটু পরে দেখা হল কৌশিক আর শরতের সাথে। তবে নটার আগেই আড্ডা ভেঙ্গেছে আজ।
এক বছর ঢাকা কেমন লাগলো? হুমম। টিভি চ্যানেল গুলো মান বেড়েছে। ATN এখনও অখাদ্য নাটক দেখায়। পালের নতুন ভেড়া Islamic TV। ইন্ডিয়ার বিখ্যাত একটা রামছাগল জাকির নায়েক। এই রামছাগলটার ছাগলামী বাংলায় ডাব করে প্রচার করাটা দেখে আমি ব্যাপক আনন্দিত!!! ইয়েহ রাইট!!!
মোবাইল ফোনের সার্ভিসে (বিশেষত GP) সুবিধা হয়েছে অনেক। আমি সাকসেসফুলি আমার PDA ফোনে চব্বিশ ঘন্টা অনলাইন থাকতে পারছি, রাস্তাঘাটে MSN এ আলাপ, কিংবা Google Maps এ ঢাকার রাস্তা দেখা কতো কিছুই না করা যায় এখন!!!
রাস্তায় গুরু ছাগল দেখা যাচ্ছে না তেমন। শুনলাম দাম নাকি চড়তির দিকে! কালেক চেক আউট করতে হবে।
শেষ করি একটা মজার খবর দিয়ে। আমাদের সময় পত্রিকার ১৭ তারিখে বের হয়েছিল।
রোডট্রিপ জিনিসটা সবার হজম হয়না। মোটাভাই আর ভাবীর ক্ষেত্রে সেটা খাটলো না। তারা কুয়ালা তেরেঙ্গানু ট্রিপে বের হয়ে ব্যাপক মজা পেয়ে গেলেন। তাই ফেরার পথেই আমরা ঠিক করেছিলাম দীপাবলীর ছুটিতে আবার বের হবো।
দীপারায়ার ছুটি কাছে এগিয়ে আসতেই ঝামেলা শুরু হয়ে গেল। শখ ছিল রেদাং দ্বীপে ঢুঁ মারবার, এমন ফটিক স্বচ্ছ নীল পানি আর বাহারী মাছের দেখা নাকি খুব সহজে দেখা যায় না। গোল বাঁধালো আবহাওয়া, নভেম্বরে এখানে বর্ষা শুরু হয়, উত্তরের সব দ্বীপগুলোতে তখন হোটেল/মোটেলগুলো বন্ধ করে দেয় মাস তিনেকের জন্য। কি করা যায়! ট্রিপ কি ভেস্তেই যায়? স্মোকিং রুমে দেখা হল অ্যাডাম রাফায়েনস্কির সাথে। ব্যাটা চান্স পেলেই সমুদ্রে যায় স্কুবা ডাইভিং করতে।
“লাঙকাওয়ি যাও, এটাই ভালো সময়”, কেন্টের স্টিকে টান দিয়ে অ্যাডাম মাথা দুলিয়ে বলতে থাকে, “ফাইভ আওয়ার্স টু কুয়ালা কেদাহ, দেন টেক আ ফেরী টু দ্য আইল্যান্ড” আমি আর মোটাভাই চোখাচোখি করি, রাজী না হবার কারনই নেই।
আমরা রওনা দেব ৭ই নভেম্বর, বুধবার। অফিস করেই বের হয়ে পড়ার ধান্দা। আমি আবার সম্প্রতি একটা স্মার্টফোন কিনেছি শখ করে, তাতে হাইস্পীড ইন্টারনেট আর জিপিএস বসানো আছে, তাই হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা নাই। লাও ইয়াত প্লাজায় গিয়ে তাতে ২০০৭ এর ম্যাপ লোড করে আনলাম, সাথে গুগলম্যাপস ফর মোবাইল। গুগলম্যাপস ফর মোবাইল কঠিন বস্তু! গুগল আর্থকে কেঁটেছেঁটে মোবাইলফোনের জন্য তৈরি করছে গুগল। সাধারন জিপিএস এর ম্যাপ যেসব স্থান কাভার করে না, গুগলম্যাপস সেসব জায়গায় বেশ কাজে আসে। মুস্কিল একটাই, মোবাইলে ডেটা কানেকশন থাকা চাই পুরোটা সময়, ফলে পয়সা খরচের একটা ব্যাপার থেকেই যায়।
প্রথমে প্ল্যান ছিল রাত একটার বাস ধরে কুয়ালা পারলিস চলে যাব, সেখান থেকে ফেরী নিয়ে লাঙকাওয়ি। বাস ধরতে হলে একটা তাড়াহুড়োর যন্ত্রনা থাকে। শেষে ঠিক হল গাড়ি নিয়েই যাব কুয়ালা কেদাহ পর্যন্ত, সেখানে তিন দিনের জন্য গাড়ি রেখে ফেরী ধরে গন্তব্যে পৌছানো হবে। কুয়ালা কেদাহ যেতে ঘন্টা পাঁচেক লাগে, যেতে হয় ইপো-র উপর দিয়ে। এই রাস্তার ব্যাপক সুনাম অসম্ভব সুন্দর চারপাশের সব দৃশ্যাবলীর জন্য। রাত একটার যাত্রা শেষপর্যন্ত শুরু হল ভোর তিনটায়। আমাদের মতো পাগল না হলে রাত তিনটায় কেউ রোডট্রিপে বের হয় না, স্পেশালী যখন আকাশ ভেঙ্গে ঝড় বাদল হতে থাকে।
কুয়ালা কেদাহ পৌছতে পৌছতে সকাল নটা বেজে গেল, টোল দিতে হয়েছে প্রায় ৩৫ রিঙ্গিত! কেদাহ থেকে লাঙকাওয়িতে ঘন্টায় ঘন্টায় ফেরী যায় (সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত যদিও), ১৮ রিঙ্গিত করে টিকেট। ফেরীতে ঠেসে মানুষ তোলে, তাই বসতে কিছুটা কষ্ট হয়। কিন্তু দেড়ঘন্টার ফেরীযাত্রার পরে যখন লাঙকাওয়ি দ্বীপ চোখের সামনে হাজির হয় তখন আর ক্লান্তি শ্রান্তি কোনটাই মাথায় থাকে না। দুপুর দেড়টার সময় আমরা যখন কুয়াহ (লাঙকাওয়ির সী-পোর্ট) জেটিতে পা দিলাম তখন আমাদের চারজনেরই মুখেই আকর্ন বিস্তৃতহাসি!
রাতের চেনাঙ সৈকত
লাঙকাওয়ি নামের উৎস নিয়ে অনেক গল্প আছে। ভাষা মালায়াতে “হেলাঙ” মানে মেছো ঈগল, আর “কাওয়ি” (সংস্কৃত) মানে মার্বেল। এই দুটো জিনিসই এখানে প্রচুর পাওয়া যায় বলে নাকি এই দ্বীপের নাম “হেলাঙকাওয়ি”, পরবর্তীতে, “লাঙকাওয়ি”। অন্য সূত্রানুসারে, “লংকা” (সংস্কৃতে যার অর্থ সৌন্দর্য) ও “য়ি” (সংস্কৃত, অসংখ্য) এদুটি শব্দের সন্ধিতেই “লাঙকাওয়ি” নামের জন্ম।
লাঙকাওয়ি দ্বীপটি কেদাহ-এর সুলতানিয়াতের অংশ ছিল। কিছু দিন থাই ও ব্রিটিশরাজের অধীনে থাকার পর এটি মালেশিয়ার অংশ হয়। জলদস্যুদের ঘাঁটি হিসেবে কুখ্যাত এই দ্বীপটি এখন মালেশিয়ার সবচে’ জনপ্রিয় টুরিস্ট স্পটের একটি এবং এর পিছনে সম্পূর্ন অবদানই সেই ড. মাহাথিরের। মাহাথির চালাক মানুষ। পুরো দ্বীপটাকে ডিউটি ফ্রি করে দিয়েছেন, সাগর তীরে পানির দামে মদ খাওয়া আর ফুর্তি করতে চাইলে লাঙকাওয়িতে না এসে কি পারা যায়?
কুয়াহ জেটিকে সাজানো হয়েছে এয়ার পোর্ট স্টাইলে, চোখ ধাধিয়ে যাবে নিসন্দেহে। জেটিতে নেমেই আমার প্রথম ধান্দা হল টাকা তোলা, এ দ্বীপে এটিএম মেশিন তেমন একটা নেই, তাই মোটা অংকের টাকা তুলে নিতে হবে সাথে, ক্রেডিট কার্ড এর কদর তেমন একটা নেই এখানে। টাকা তুলবার পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ন কাজ হল একটা গাড়ি যোগাড় করা। গাড়ি নিতে লাইসেন্স থাকতে হবে, সেটা আসল নকল যাই হোক না কেন। পাজেরো থেকে মিনি সবই ভাড়া দেবার জন্য সাজানো, আমি হ্যাচব্যাক চালিয়ে অভ্যস্ত তাই একটা কেলিসা নিয়ে ফেললাম। কেলিসা ছোট্ট ছিমছাম গাড়ি, দিন প্রতি ৮০ রিঙ্গিত ভাড়া। মোটাভাই ৯০ রিঙ্গিতে একটা প্রোটন ভিরা নিলেন (নিশান সেন্ট্রা নিলে ১৩০)।
লাঙকাওয়ি দুর্দান্ত সব হোটেল আছে, তাদের প্রাইভেট বীচ-ও আছে। প্রাইভেট বীচ শুনতে আহামরি হলেও সুস্বাদু নয়। আমদের গন্তব্য পানতাই চেনাঙ বা চেনাঙ সৈকত। চেনাঙ সৈকতের ধারে অনেকগুলো চমৎকার মোটেল আছে, মানুষও যায় প্রচুর, তাই একটা উৎসবমুখরতা থাকে সবটা সময়। গেলবার ছিলাম এবি মোটেলে, এবারো রুম খালি পেয়ে উঠে গেলাম। এবি মোটেল এর ভাড়া ৯০ রিঙ্গিত। এসি রুম, দুটো ডাবল বেড। ওয়াইফাই আছে, আছে সাইবার ক্যাফে, লন্ড্রী, রেন্ট-এ-কার (এবং মোটরবাইক ও সাইকেল)। জানিয়ে রাখলে টুর ম্যানেজ করার ব্যবস্থাও আছে। মোটের উপর এর চেয়ে সস্তায় আর ভালো কিছু পাওয়ার কথা ভাবাই যায় না। এদের খাবারও খুব ভালো, আর দামেও কম।
এবি মোটেলের ঠিক সামনেই সৈকত। সৈকতে শুয়ে বসে বইপড়া আর খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত সবাই। যাদের বেশী শখ তারা কেউ জেটস্কি নাহলে প্যারাগ্লাইডিং করে ফিরছে। আমরা গেছি রিল্যাক্স করতে, পানিতে পাডুবিয়ে বসে থাকতে পারলেই চলে।
লাঙকাওয়িতে দেখার জিনিস আছে প্রচুর। বার্ডপার্ক আর আন্ডারওয়াটার ওয়ার্ল্ড চমৎকার জায়গা । তবে তার চাইতে স্পীডবোটে চড়ে আইল্যান্ড হপিং এ বের হওয়া কিংবা ম্যানগ্রোভ বনে ঘুরে আসলে ভালো লাগবে বেশী। তবে চরমতম আকর্ষনীয় হল পুলাউ পায়ারে মেরিন পার্ক দেখতে যাওয়া। প্রায় ২০০ রিঙ্গিত লেগে যেতে পারে যদি স্কুবা ডাইভিং করার ইচ্ছা থাকে। পুলাউ পায়ার ছোট্ট দ্বীপ, এর ফটিক স্বচ্ছ পানিতে হাজারো রঙিন মাছের বাস, স্নোরক্লিং পাগলদের তীর্থস্থান বলা যেতে পারে (যেতে গেলে অন্তত একদিন আগে বুকিং দিতে হয়, না হলে পস্তাতে হবে আমার মতো)।
প্রথম দিন মাশীদ আব্দার শুরু করলো রাজকন্যা মাহশুরীর মোসেলিয়াম দেখবে বলে। মাহশুরীর বিয়ের কথা ছিল কেদাহর সুলতানের সাথে। কিন্তু মিথ্যা ব্যভিচারের দায়ে তাকে মৃত্যূদন্ড দেওয়া হয়। মাহশুরী মরবার আগে অভিশাপ দিয়ে যান লাঙকাওয়ি দ্বীপকে। মোসেলিয়াম এ হাজির হয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে হল। টুরিস্টদের পকেট হাতড়ে দুটো টাকা নেওয়ার জন্য এরা মহা তৎপর।
ফেরার পথে কুয়াহ থেকে একটা ম্যালিবুর বোতল কেনা হল (শোমচৌ এর কুবুদ্ধি!), সৈকতে থাকবো আর ক্যারিবিয় পানীয় গলায় ঢালবো না তা কিভাবে হয়!
প্রচুর টুরিস্ট আসে বলে এখানে দোকান পাটের সংখ্যা কম নয়। শুধু চেনাঙ সৈকতের ধারেই দেখা যাবে শ’খানেক দোকান-কাপড়, জামা, জুয়েলারী, কিউরিউ কিংবা কনভিনিয়েন্স! অনেক কিছুই কেএল এর সেন্ট্রাল মার্কেটে পাওয়া যায়। কিন্তু সেন্ট্রাল মার্কেটের কথা আর কজনই বা জানে?
পরদিন সকালে মোটাভাই এর গাড়িতে চড়ে আমরা বের হলাম গুনুঙ রায়া পাহাড়ের দিকে। গুনুঙ রায়া এই দ্বীপের সর্বোচ্চ পাহাড়। এই চূড়োয় গেলে নাকি থাইল্যান্ডও দেখা যায়। মোটাভাই ভালো পাইলট, ভয়ঙ্কর আঁকাবাঁকা পাহাড়ী রাস্তায় গাড়ি তরতরিয়ে নিয়ে গেলেন। পাহাড়ী রাস্তার দুপাশে ঘন ট্রপিকাল রেইনফরেস্ট। খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে সব উঁচু উঁচু গাছ। একটু পর পরই রোড সাইন, সর্তক করে দিচ্ছে সাম্ভাব্য পাহাড়ী ধ্বস থেকে। রাস্তাধরে কিছু দূর যাই আর দেখা হয় একদল বানরের সাথে। এই দ্বীপে এতো বানর আছে সেটা জানা ছিল না। গুনুঙ রায়ার মাথায় কারা যেন রিসর্ট বানাচ্ছে, এখনো পুরোটা শেষ হয়নি, আমরা তারই পার্কিং এ গাড়ি রেখে দৃশ্য দেখতে বের হলাম। উচ্চতম শৃঙ্গ থেকে এই স্বপ্নদ্বীপ দেখা এক অসাধারন অভিজ্ঞতা।
পাহাড় চুড়োয় বেশ ঠান্ডা, ভ্যাপসা গরমের দেশে বড়ই আরামদায়ক, উপরন্তু গাড়ির এসি কাজ করছিল না! মিনিট বিশেক থেকেই আমরা নামতে গেলাম। মাঝপথে বিচিত্র আওয়াজ শুনে গাড়ি থামলো। এ যে ধনেশ পাখি! এর আগে পাঙকোর দ্বীপে ধনেশ দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। এখানে আবার দেখে ছবি তুলতে গেলাম। ভীতু পাখিটা ক্যামেরা টের পেয়েই ভাগলো। কপাল ভালো ছিল, একটা শট কোনমতে নেওয়া গেছে!
গুনুঙরায়া পাহাড়ে দেখা ধনেশ পাখি
গাড়ি আবার চলা শুরু করলো, হঠাৎ ভীষন বাজে গন্ধ! নাড়িভূড়ি দলা পাকিয়ে বের হয়ে যায় যায়। পিছনে কিছু একটা পড়ে আছে, সম্ভবত গন্ধ সেখান থেকেই। মোটাভাই খাড়া রাস্তায় রিভার্সে যাওয়া শুরু করলেন, কৌতুহল কঠিন জিনিস। কাছে গিয়ে ছবি তোলা গেল না, অসম্ভব পচাঁ গন্ধ যে! কিন্তু আমরা হতবাক, জিনিসটা আর কিছুই না, পাচঁ ফুট লম্বা একটা অজগর, সম্ভবত গাড়ি চাপা পড়ে মারা গেছে কদিন আগে, সেটাই পঁচে গিয়ে দুর্বিষহ গন্ধে পাগল করেছে চারদিক!
ম্যানগ্রোভ জঙ্গল
ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের বানর
দুপুরে লাঞ্চ করে আবার অভিযান, এবার যাত্রা ম্যানগ্রোভ বনে। সাগরের নোনা পানির পাড়ের গাছগুলোতে শ্বাসমূল জন্মায়। সুন্দরবনে এমন গাছ প্রচুর, এখানেও যে আছে সেটা জান্তাম না। স্পীড বোটে করে ছোট খাড়ি ধরে যাচ্ছি আমরা। দুপাশে ঘন বন। তাতে যতো না পাখি তার চেয়ে বেশী বানর।
দীর্ঘকান্ডের নিরক্ষীয় বৃক্ষরাজি
নৌকাওয়ালা আমাদের তীরে নামিয়ে দিয়ে হাতে একটা টর্চ ধরিয়ে দেয়। তারপর পট করে গায়েব হয়ে গেল। ম্যানগ্রোভ বনের মাঝে কাঠের ব্রীজ, সেই ব্রীজ ধরে যেতে হবে। আমাদের গুহা দেখবার শখ বড়, বলা হয়েছে সামনে পড়বে বাদুরগুহা। গুহামুখ দেখতে পেয়ে ঢুকে গেলাম। স্ট্যালাকসাইট (stalactite) এর কথা ভূগোল বইতে পড়েছিলাম, চাক্ষুষ দেখার সুযোগ পেয়ে মন্দ লাগলো না। এদিকে মোটাভাই টর্চ নিয়ে বাদুড় খুঁজতে উঠে পড়ে লেগেছেন। আমি ব্যস্ত ছবি তোলায়। ফ্ল্যাশ জ্বলতেই অবাক, পুরো গুহার ছাদ জুড়ে হাজারো বাদুড় ঝুলে আছে! ভাগিস্য এরা অযথা উড়ে বেড়ায় না! নাহলে প্যানিক করে মাশীদ আর বর্না ভাবী মারা যেত!
বাদুড় গুহা
কুমির গুহায় দুঃসাহসী মহিলারা!
ম্যানগ্রোভের ধনেশ
বাদুড় গুহা দেখে নৌকা রওনা দিলো মোহনার দিকে। সেখানে জাল দিয়ে ঘেরা জায়গায় অদ্ভুত সব মাছ দেখিয়ে পয়সা কামাচ্ছে এক মালে পরিবার। জলজ্যান্ত মোরে ঈল, স্টিং রে, স্টিং কাকড়া, ব্যাটফিশ এবং আরো অনেক মাছ। মাশীদ খুব শখ করে স্টীং রে টাকে টুনার টুকরা খাওয়াবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মাছটা এতো এগ্রেসিভ যে বেচারী সাহস পেল না বেশীক্ষন চেষ্টা করার। নৌকাওয়ালাকে কোক ঘুষ দেবার বদৌলতে সে মোটাভাইকে ওপেন সী-তে বোট চালানোর অফার দিয়ে বসলো। মোটাভাই চারচাক্কার ওস্তাদ, প্রপেলারের ওস্তাদ হবার সুযোগ ছাড়েন কি করে!
ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূল
রাতে আমরা খেলাম ভারি চমৎকার একটা রেস্তরায়, নাম রোজ টি। থাই খাবারের দোকান। বলা দরকার যে এই দ্বীপটি থাইল্যান্ড থেকে ৪৫ মিনিট দূরে, আর আগে শ্যাম রাজের অধীনেও ছিল। তাই থাইদের প্রভাব আছে ভালোই।
তৃতীয় দিনে আমার যাবার কথা ছিল পুলাউ পায়ারে। বুকিং না দেওয়ায় যাওয়া হল না। মন খারাপ করে মাশীদকে নিয়ে বার্ড পার্কে গেলাম। গতবার বার্ড ফিডিং করতে গিয়ে মজা হয়েছিল। পাখি দিয়ে ছেয়ে গিয়েছিল সারা শরীর। এবারো খাবার কিনে ঢুকলাম ভিতরে। পাখিরা এবারে তেমন খাবার ধান্দায় না থাকলেও, একটা কালো বানর ব্যাপক সৌজন্যের সাথে মাশীদের দেওয়া বাদাম খেয়েছে। এক পর্যায়ে আমার স্ত্রী বলেই ফেললেন এই বাদরটাকে কোলে নিয়ে তিনি সারা জীবন বাদাম খাওয়াতে রাজী। চিন্তার বিষয়!
বার্ড পার্ক থেকে ফিরতে গিয়ে জানলাম আইল্যান্ড হপিং এ পুলাউ বেসারে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানকার হালকা ঘোলা পানিতে কিঞ্চিৎ স্নোরক্লিং করা যেতে পারে। আর যায় কোথায়। আমি লটকে গেলাম। স্পীডবোটে প্রায় আটজন যাত্রী, লাইফ জ্যাকেট পরা সবারই। সাগরে ভীষন ঢেউ ওঠে, সাবধান না হলে অঘটন ঘটে যেতে পারে। আমার কিছু হয় নি, শুধু একপাটি জুতো গায়েব হয়ে গেল!
দুয়ুঙ দ্বীপের কালো বানর
আইল্যান্ড হপিং এর প্রথম কাজ হল ঈগল ফিডিং। পানিতে টুনার টুকরো ছুড়ে মারা হয়, লাঙকাওয়ির বিখ্যাত সব “হেলাঙ” (মেছো ঈগল) ছোঁ মেরে তা খেতে আসে। সেই দৃশ্য ক্যামেরা বন্দী করতে বড় বেগ পেতে হল। লাঙকাওয়ির ঈগল - ১
লাঙকাওয়ির ঈগল - ২
পুলাউ বেসার গিয়ে দেখি কেউ লাইফ জ্যাকেট ভাড়া দেয়না। অগত্যা সেটা ছাড়াই হাটু পানিতে স্নোরক্লিং করতে নামলাম। লাভের মধ্যে লাভ হল, লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই পানিতে ভাসা শিখে গেলাম! এবার একটা জোড়া ফ্লিপার কিনতেই হবে দেখছি!
মাশীদও পানি দেখে নেমেছিল, তবে বেচারী কেন যে ঠিক সুবিধা করতে পারলো না বোঝা গেল না। এনিওয়ে ৩৫ রিঙ্গিতের এই ট্রিপটার আনন্দ কোন অংশেই কম না। দুঃখ শুধু পুলাউ পায়ারের জন্য।
সন্ধ্যায় মাশীদ আর বর্না ভাবী শখ হল শাড়ী পড়ে সাগরে নামার। সুর্যাস্তে নামার প্ল্যান থাকলেও তারা নামলো আঁধার হয়ে যাবার পরে। লো লাইটে বহু কষ্টে ছবি তুলতে হল।
আমি জীবনের প্রথম মার্গারিটা খাই এই চেনাঙ বীচে। বার টেন্ডার দেখতে ছিল একেবারে বব মার্লের ছোট ভাই। এবার তাই মাশীদেরও শখ ছিল এদের মার্গারিটা চেখে দেখার। খোঁজ নিতেই জানা গেল বারটা উঠে গেছে। সামনে আরেকটা বার দেখে বসে গেলাম। একদম খোলা সৈকতে টেবিল। ককটেইল আর তাপাস পাওয়া যাবে। মার্গারিটার সাথে আন্দালুসিয়া ক্যালামারী আর সফ্ট শেল ক্র্যাব ফ্রিটার নেওয়া হল তাপাস হিসাবে। ক্যালামারী হল রিঙ এর মতো করে কেটে ডিপ ফ্রাইড স্কুইড! সফ্ট শেল ক্র্যাব আমার অতি প্রিয় জিনিসের একটা। সদ্য খোলস বদলানো কাকড়ার খোসা খুব নরম হয়, চিবিয়ে খেতে সমস্যা হয় না। এখন সেই জিনিসকে যদি টেম্পোরা স্টাইলে ভাজা হয় তখন তার স্বাদ হয় অমৃততূল্য! মুস্কিল হল, তাপাসের স্বাদ লোভনীয় হলেও মার্গারিটা ছিল চরিত্রহীন। চরিত্রহীন মার্গারিটা খাওয়া মহা অন্যায়!
যাই হোক, ছোট্ট এই ছুটিতে লাঙকাওয়ি দেখা সহজ নয়। বুধবার গিয়ে রোববারে ফিরে আসতে হলে মন খারাপ হয়ে যায়। কি আর করা! সোমবারে তো অফিস। কতো জায়গা এখনও দেখা হয়নি, পাহাঙ, কাপাস, রেদাঙ, পেরহেন্থিয়ান... ধূর! আবার কবে যে একটা লঙ উইক এন্ড পাই?
বহুদিন ধরেই শুনছিলাম রিস্কি হামিদ আর অফিসের আরো কয়েকজন মিলে টিমবিল্ডিং সেশন নিয়া নানা পরিকল্পনা করে যাচ্ছে। মাল্টিন্যাশনালে বহুরকম মানুষ কাজ করে, তাদের মাঝে দূরত্ব কমাতে টিমবিল্ডিং এর নামে একসাথে খেলাধুলা আর ফুর্তি করা হয়। সে যাই হোক, গরম ইসু যেটা ছিল তা হল টিমবিল্ডিং এর জন্য যাওয়া হবে কোথায়? রিস্কি চায় বালি যেতে, আরেকদল বলে চল ইস্ট মালেশিয়ায়। আমি একটা নিরস ডিপার্টমেন্ট কাজ করি বলে এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। ডানহিলে লম্বা টান দিয়ে অন্য চিন্তায় মন দেই।
মালাক্কা থেকে ফিরেই রিস্কির সাথে দেখা। "৩ তারিখে কিন্ত সাবা যাচ্ছি, মনে রাইখো""সাবা? আমার ভিসায় তো বলা ওনলি ফর ওয়েস্ট মালেশিয়া.. সাবায় যাবো কিভাবে?""ওইখানে গেলেই দিবেনে.. পাসপোর্ট সাথে নিও", বলে রিস্কি ভেন্ডিং মেশিনের দিকে রওনা দেয়।
মানচিত্রে মালেশিয়া ও সাবা
সাবার অনেক কাহিনী শুনেছি। এর আদ্যোপান্তই আলাদা। মালেশিয়ার মূল ভূ-খন্ডে অবস্থিত নয় এমন দুটি প্রদেশ হল সাবা আর সারাওয়াক। ম্যাপ খুললে দেখবেন সাবা, সারাওয়াক আর ইন্দোনেশিয়া আলাদা একটা দ্বীপের মতো স্থানে অবস্থিত। আবার সাবা, সারাওয়াকের মাঝে লটকে আছে ব্রুনেই। সাবাহ আর সারাওয়াক আসলে আগে ব্রুনেই এরই অংশ ছিল। প্রতিরক্ষাগত কারনে ব্রুনেই এর সুলতান এই প্রদেশ দুটোকে লীজ দেয় আমেরিকান দের। আমেরিকানদের হাত ঘুরে এর শাসক হয় ব্রিটিশরা। মালেশিয়ার জন্মকালে এরা মালে ফেডারেশনে ঢুকে পরে স্বতন্ত্র রাজ্য হিসেবে। মালেশিয়ার অংশ হলেও মালেশিয়ানদের সাবাতে ঢুকতে ভিসা লাগে (যদিও সেটা অন-অ্যারাইভাল)। মালেশিয়া সরকারও সাবার মানুষকে যতোটা সম্ভব খুশি করে চলে।
সাবা আর সারাওয়াক হল এই অঞ্চলের কিছু শ্রেষ্ঠ রেইনফরেস্ট আর ডাইভিং স্পটের জন্য বিখ্যাত। সাবার সান্দাকান দ্বীপ হল ওরাংউটান এর বাসভূমি। সিপাদান বিখ্যাত সী-টার্টল আর অসাধারন মেরিনলাইফ এর জন্য। এসব জানার পর সাবা সম্পর্কে উতসাহী না হয়ে পারা যায় না। উইকএন্ডে গেলাম লাও ইয়াত প্লাজায়। ক্যামেরার জন্য একটা আন্ডারওয়াটার কেসিং আর নতুন দুজোড়া হাইক্যাপাসিটির ব্যাটারী কিনবার খায়েস। ব্যাটারী পাওয়া গেলেও কেসিং পাওয়া গেল না, অর্ডার দিতে হবে, ডেলিভারী কমপক্ষে দু'হপ্তা, আর সবচে বড় কথা হল দাম প্রায় ষোল হাজার টাকার মতো। স্বচ্ছ প্লাস্টিকের একটা কেসিং কেন ৮০০ রিঙ্গিত দাম হবে মাথায় ঢুকলো না। মনের দুঃখে একটা শর্টস কিনে বাড়ি ফিরলাম।
অফিস থেকে বলেছে ভোর ৪টায় লবিতে জমায়েত হতে। লটবহর হাতে নিয়ে যখন পৌছালাম রিস্কি তখন ডজনখানেক কার্লসবার্গ খেয়ে পুরা আউট। আমরা প্লেনে যাব, বাজেট এয়ার লাইন, নাম এয়ার এশিয়া। বাজেট এয়ারলাইন হলে কি হবে, এরা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের স্পনসর।
আমাদের প্লেন KLIA থেকে না উড়ে, ডানা মেলবে LCCT থেকে। LCCT-কে KLIA এর ধারেকাছেও তুলনা করা যায় না। বাজেট এয়ার লাইনে এয়ার হোস্টেসরাও "বাজেট-বিউটি" নিয়ে ঘোরে সেটা জানা ছিল না। এয়ার এশিয়ার হোস্টেসদের পোষাক কিঞ্চিত আপত্তিকর-রকম ছোটখাট হলেও তাদের ভাঙ্গাচোরা চেহারা দেখে উদ্দীপনা দমে যেতে বাধ্য, এবিষয়ে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে প্রায় সবাই মতৈক্যে পৌছাল। এদের প্লেনে সীট নাম্বার নেই। প্রায় প্লেনে ওঠার সময় প্রায় সবাই আক্ষরিক অর্থে দৌড়ায়। কোনমতে বসতে পারাই একটা বড় অ্যাচিভমেন্ট!
সাবা পৌছাতে প্রায় দুঘন্টা লাগে। প্লেন থেকে নেমে জানতে পারলাম এই শহরটার নাম কোটা কিনাবালু। এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনে বরাবরেই মতো আমি আর রিস্কি আটকে গেলাম। ভিসায় পূর্ব মালেশিয়ার কথা নেই, মুখ গম্ভীর করে অফিসার ইতিউতি করেন। সমাধান করলেন বড়কর্তা। ৩০ দিনের প্রবেশাধিকার পাওয়া গেলে অবশেষে।
এয়ারপোর্টে টুর গাইড বাস দিনে রেডী ছিলেন। গাইডের নাম জে, চীনা আর সাবানদের মিক্স! ভীষন রসিক। আমাদের থাকার জন্য ঠিক করা হয়েছে শাংরিলার তান্জুল আরু রিসর্ট। একে ফাইভ স্টার, তারপরে সৈকতের ধারে। ২০০ মার্কিন ডলারের রিসর্টে নিজের পয়সার থাকা সম্ভব না। মনে মনে বললাম, "আহা!"
১১টার দিকে আমরা রওনা দিলাম কিলু নদীর দিকে। সেখান হোয়াইট ওয়াটার ড়্যাফটিং করার ধান্দা! প্রচন্ড আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে কিলু নদীর তীর পৌছাতে ঘাম বের হয়ে গেল।
গুগল আর্থে সাবার কিলু নদী (হলুদ মার্ক: র্যাফটিং শুরু এখান থেকে)
ল্যাইফভেস্ট আর হেলমেট পড়ে গেলাম ব্রিফিং এ। ১৫ মিনিট পরে আমরা সবাই ড়্যাফ্ট নিয়ে বৈঠা বাইতে শুরু করেছি। কিলু পাহাড়ী নদী, ভীষন খরস্রোতা। ড়্যাফট এ উঠে বিভিন্ন "চীপা"য় পা গুঁজে বসতে হয় যেন না পড়ে যান। স্রোত বেশী হলে ক্যাপসাইজড (ভেলা উল্টে যাওয়া) হবার ভয় থাকে। তাই প্রতি ভেলাতেই একজন দক্ষ গাইড দেওয়া হয়েছে। আমার ফিটনেস কম। একটু বৈঠা মারতেই হাত ব্যথা করে উঠলো। একটু পড়েই ড়্যাফটিং কি কতো প্রকার বোঝা গেল, প্রচন্ড স্রোতে ভেলা লাফ মারে প্রায়, কে জানি ছিটকে পড়েই গেল পানিতে।
কিলু নদীতে হোয়াইট ওয়াটার র্যাফটিং
বার দুয়েক আমাদের ভেলা পাথরে দড়াম করে ধাক্কা খেল। হঠাত গাইড বলল, সামনে ক্যাপসাইজ হবার সম্ভাবনা আছে। তার কথা প্রায় সত্যি করে ভেলাটা উল্টে যাবে যাবে করেও শেষমেষ টিকে গেল। হাঁপ ছাড়লাম সবাই। ড়্যাফটিং শেষে শুনি বডি ড়্যাফটিং হবে, মানে শরীর দিয়ে ভেসে ভেসেই নদীতে এগুতে হবে। বিষয়টা শুনতে যতো সহজ, কাজটা ততোটা নয়। এবং মানইজ্জতে মাথা খেয়ে আমি পানিতে খাবি খাওয়া শুরু করলাম। সারা শরীর ভাসলেও মুখ একটু পর পর পানিতে ডুবছে, না পারি শ্বাস নিতে, না পারি ভাসতে। মনে হল মরে যাচ্ছি, স্রোত ভেসে চলে যাব দূরে, সব আশা শেষ। সুযোগ পাওয়া মাত্র জবাই করা খাসীর মতো কন্ঠে চিতকার করলাম, "হেল্প, হেল্প, হেল্প!!"
মিনিট পাঁচেক পর গাইড উদ্ধার করে আমাকে। ইত্যবসরে আমার খাবি খাওয়ার ঘটনা পুরোটা ভিডিও করা হয়ে গেছে, মোটামুটি আগামী বছর তিনেক হাসির খোরাক দিতে পারবে সেটা।
দুপুরে খাওয়াদাওয়া হল নদীর কাছেই রিভারবাগের রিসর্টে। যখন হোটেলে ফিরলাম তখন প্রায় সবারই শরীররে বিভিন্ন জায়গায় ছড়ে গেছে আর টনটনে ব্যথা সব জায়গায়। টিমবিল্ডিং মাই ফুট। রাতে ডিরারের পরে দুঘন্টার জন্য ফ্রী ফ্লো শীভাস রিগ্যাল আর কার্লসবার্গ। এর পরের ঘটনা না বলাই ভালো। সকালে উঠে জানলাম রিস্কি পোল ড্যান্সে করে ফাটিয়ে ফেলেছে। আমি ছেলে ভালো। মাতাল হলে ঝামেলা করিনা। তারপরো মনে হল বলি ধরণী দ্বিধা হও।
সাগরতীরে টিম বিল্ডিং
দ্বিতীয় দিন গেলাম KK Adventure Park এ। গতদিনের ধকল আর হ্যাংওভারের ফলে লাফঝাঁপ নিয়ে কোন আগ্রহ ছিল না। চামে চিকনে শুয়ে বসে পার করলাম। তবে যখন সাগরে কায়াক (নৌকা) চালানোর ডাক এলো তখন কি বসে থাকা যায়। কায়াক চালাতে হাতে জোর লাগে প্রচুর। দশ মিনিটের মাথায় আমি আর চিয়া ওয়েন দুজনেই হাল ছেড়ে দিলাম। এর চেয়ে লাইফ জ্যাকেট পরে ভেসে থাকা অনেক মজার। রাতে ডিনার ভালো ছিল। তবে আবার মাতাল হবার কোন ইচ্ছা ছিল না। ইনাফ ইজ ইনাফ!
সাপি দ্বীপ
তৃতীয় দিনে, স্পীডবোটে করে রওনা দিলাম সাপি দ্বীপে। সবারই গভীর উত্তেজনা, কারন সী ওয়াকিং করা হবে। সী ওয়াকিং আর কিছুই না। মাথায় একটা ৩৫ কেজি্র হেলমেট পরে পানিতে নামতে হয়। পাইপে করে উপর থেকে বাতাস পাঠানো হয়, তাই অক্সিজেন ট্যাংক কাধে নিয়ে বেড়ানোর ঝক্কি নেই।
সী ওয়াকিং
আট থেকে আটান্ন বছরের সবাই এই কাজটা করতে পারে অবলীলায়, যা স্কুবা ডাইভিং এর ক্ষেত্রে চলে না। সাপি দ্বীপের সৈকতে টুংকু আব্দুল রহমান মেরিন পার্ক। সেখানে হাজারো রকম মাছের আনাগোনা। সী ওয়াকিং এ আমরা সেই সব রঙবেরঙ এর মাছ গুলোই দেখবো।
আমার পালা এলো দ্বিতীয় ব্যাচে। সে এক অসাধারন অভিজ্ঞতা! মাছে মাছে মেলা বসে যায় ফটিক স্বচ্ছ নীল পানিতে। মনে হবে হাটছেন অ্যাটলান্টিসের তলদেশে। ফাইন্ডিং নিমোর সেই ক্লাউন অ্যানেমনফিশ দেখার সুযোগ হল। পোষা মাছের মতো শৈবালে ছুটে বেড়াচ্ছে সে।
সী ওয়াকিং শেষে, বাকিটা সময় কাটালাম স্নরক্লিং করে। এই কাজটা এখন বেশ ভালোই পারি। পানিতে নেমে আমি অবাক! ব্যাট ফীশ, সার্জেন্ট মেজরসহ হাজারো ডেমসেল ফিশ, প্যারট ফীশ আর কোরাল দেখে আমি পাগল! আধাঘন্টা বাদে হঠাত পায়ে কি যেন কামড়ে দিল। আমি পড়ি কি মরি করে ছুটলাম তীরে। কালো ডেমসেল মাছগুলো ডিম পেড়ে পাহারা দিচ্ছিল । আমার পদধূলি পছন্দ না হওয়া কামড়ে দিয়েছে। তীরে এসে দেখি রক্ত বের হয় ভালোই দাগ হয়ে গেছে। ভীতু মানুষ তাই আর পানিতে নামলাম না। পরে রাও এর কাছ থেকে শুনলাম আরও বিপদের গল্প। পায়ে ক্ষত নিয়ে সে সী-ওয়াকিং এ গিয়েছিল। একটু পরে সে আবিস্কার করে মাছ গুলো রুটির টুকরো বাদ দিয়ে তার ক্ষত কামড়ে যাচ্ছে গভীর আগ্রহে। তাই সাবধানবানী: উন্মুক্ত ক্ষত নিয়ে সাগরে নামবেন না।
গুগল আর্থে টুংকু আব্দুল রহমান পার্ক, সাপি দ্বীপ এবং সীওয়াকিং স্টেশন
সাপি দ্বীপের সৈকতে
জেটিতে নেমেই দেখেছি জেলী ফিশের নোটিশ। রমেশ দাবী করে বসলো তারপায়ে নাকি লেগেছেও একটা। জেলী ফিশের সাথে পরিচিত না হলে বেশ বিতিকিচ্ছিরি ঘটনা ঘটতে পারে। মরন হবে না, কিন্তু জ্বলুনী মারাত্বক! সাপি দ্বীপের ডেমসেল মাছের ঝাঁক
রাতে কেএল ফেরার আগে সবাই গেল ফিলিপিনো মার্কেটে ঢু মারতে। সাবার শুটকি (ইকান মাসিন) খুবই ভালো। মজার বিষয় হলো, এরা ইলিশের শুটকি খুব পছন্দ করে। দেশের মাছ বলে কথা, তাই দুটো ইলিশ কিনেই ফেললাম। ফিলিপিনো মার্কেটে ইকান মাসিনের (শুটকি মাছ) বাজার
রাতে এয়ারপোর্ট যেতে যেতে মনে হল আবার আসা দরকার। সেন্দেকানে উরাং উটান সিপাদান দ্বীপের কাছিম না দেখলে চলে না। আরেকটা দেখার জিনিস মাউন্ট কিনাবালু। বলা হয় দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার সর্বোচ্চ পর্বত এটা। মেঘের কারনে এবার দেখাই হল না। নাহ, মাশীদকে নিয়ে আবার আসতেই হবে কোন দিন।
গাড়ি কেনার আগে থেকেই ইচ্ছা ছিল ড্রাইভ করে মালাক্কায় যাব। আমার বাড়ি থেকে সোজা সেরেম্বান হাইওয়ে ধরে দক্ষিনে দুঘন্টা গেলেই মালাক্কা (Melaka)।
শুক্রবার রাতে ভীড়ভাট্টা বেশী, তাই শনিবার রওনা দিলাম (২৫ অগাস্ট)। ঘুম থেকে সকালে উঠি না, তাই বেরুতে বেরুতে ১টা আর পৌছালাম তাই ৩টার দিকে। পুসাত বান্দারায়া (সিটি সেন্টার) পৌছাতে কষ্ট হল না, ছোট্ট ছিমাছাম একটা শহর। মুস্কিল হল পার্কিং নিয়ে। কোথাও জায়গা না পেয়ে "দাতারান পালোয়ান" মেগামলের সামনের রাস্তার অন্যদের দেখাদেখি গাড়ি রাখলাম। কাজটা যে ঠিক হয়নি সেটা বুঝতে পেরেছি ঘন্টা তিনেক পরে।
Stadhuys Building, মালাক্কা
"দাতারান পালোয়ান" মেগামল, মল হিসেবে ক্লাস ওয়ান, এবং দীর্ঘ ভ্রমনের পর ক্লাস ওয়ান মলের ধারে পাশে থাকলে টয়লেটে ঘুরে আসা অবশ্য কর্তব্য! মল থেকে বের হয়ে আমরা হাটা দিলাম সেন্ট পল এর গীর্জার দিকে। ওদিকটা সবসময়ই জমজমাট থাকে। মালাক্কা মিউজিয়ামের শহর, প্রায় ডজন দুয়েক মিউজিয়াম আছে এখানে! মরার রয়াল কাস্টমসও একটা মিউজিয়াম খুলে বসে আছে! সেন্ট পল এর গীর্জা একটা ছোট টিলার উপরে গড়া। ১৫২১ সালে দুয়ার্তে কোয়েলো গীর্জাটি নির্মান করেন। গীর্জার ভেতরে একটা ছোট সমাধিক্ষেত্র আছে। উচু জায়গায় বলে পুরো মালাক্কার একটা চমৎকার ছবি দেখা যায়।
সেন্ট পলস্ থেকে নেমে সমুদ্র ধরে হাটতেই চোখে পড়ল পুরোনো পর্তুগীজ জাহাজ। জাহাজটাকে রেনোভেট করে মিউজিয়াম বানানো হয়েছে, কিন্তু সংস্কারের কাজ চলছিল বলে ঢোকা গেল না।
ম্যাপ দেখে ঠিক সুবিধা করতে পারছিলাম না, হাতে ট্র্যেকিং জিপিএস থাকায় রাস্তা হারাচ্ছিলাম না কিন্তু কিছু খুজেও পাচ্ছিলাম না। তাই ৪০ রিঙ্গিত ঘন্টা হিসেবে রিক্সা ভাড়া নিলাম। গন্তব্য চায়না টাউন, স্পেশালী জংকার স্ট্রীট। রিক্সাওয়ালা গাইড হিসেবও কাজের, নিয়ে গেল বাবা-নিয়োনইয়া ঐতিহ্য দেখাতে। চীনারা মালে মেয়েদের বিয়ে করে নতুন একটা অনন্য, সংকর কৃষ্টি তৈরি করে যা পরে বাবা-নিয়োনইয়া (Baba-Nyonya) কৃষ্টি হিসেবে পরিচিত। বাবা-নিয়োনইয়া ঘরানার খাবার বেশ বিখ্যাত। স্বাদ নিতে গেলাম রেস্তোরান ন্যান্সী'স-এ। খাবারে মিস্টি ভাবটা কম থাকলে অসাধারন বলা যেত নির্দ্বিধায়। জংকার স্ট্রীটে পৌছে দেখি চারদিকে পাইনাঅ্যাপল টার্ট এর পসরা। পাইনাঅ্যাপল টার্ট মালাক্কার আরেক আকর্ষন, পর্তুগীজদের থেকে পাওয়া এই জিনিস গরমাগরম খাবার মজাই আলাদা। টুরিস্ট প্রচুর বলে এখানে অ্যান্টিক আর ক্র্যাফ্টস এর দোকান প্রচুর। মাশীদ লটকে গেল সেসব দেখতে, সেই ফাঁকে আমি গেলাম গাড়ির খবর নিতে। গিয়ে দেখি ৩০ রিঙ্গিত ফাইন করেছে পার্কিং টোকেন কিনিনি বলে! যাই হোক পরের দিনের টোকন কিনে মাশীদের খোজে রওনা দিলাম। শুনেছিলাম "উজাং পাসির" এর রাস্তা ধরে গেলে পর্তুগীজ ভিলেজ পড়বে, কয়েকবার হারানো পরে আমার হাজির হলাম শেষপর্যন্ত। তবে জেনুইন পর্তুগীজ খাবার খুজে পাওয়া মুস্কিল! খিদে না থাকায় ফের জংকার স্ট্রীটে, তবে তার আগে হোটল নিতে হবে। হোটেল পুরী ভারি চমৎকার একটা হোটেল, কিন্তু ভাড়া ২২০ এর মতো। সামনে একটু দূরেই বাবা হাউসের ভাড়া ৯৫ রিঙ্গিত সাথে ব্রেকফাস্ট আর পার্কিং। দেরী না করে একটা ঘর নিয়ে দৌড় দিলাম জংকার স্ট্রীটের নাইট মার্কেটে। পাসার মালাম (নাইট মার্কেট)হিসেবে বেশ ভালো বলতে হয়, কাঁচা বাজারের বদলে অ্যান্টিক, ক্র্যাফ্টস আর খাবার এর বিকিকিনি। জংকার-এ একটা চমৎকার পাব আছে নাম জিওগ্রাফার্স ক্যাফে, লাইভ মিউজিক থাকায় একটা হাইনিকেন নিয়ে বসে গেলাম, ইত্যবসরে মাশীদ এদোকান সেদোকানে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। Stadhuys Building-এ আরেকটা মিউজিয়াম, রাত নটা পর্যন্ত খোলা থাকে। হাতে সময় থাকায় ঢুঁ মারতে গেলাম। তেমন আকর্ষনীয় এক্সিবিট ছিল না, হুদাই চারটা রিঙ্গিত নষ্ট!
মালাক্কার ইতিহাস একটু বলি এই ফাঁকে। ১৩৭৭ সালে পরমেশ্বরা মালাক্কায় পালিয়ে আসেন সুমাত্রা থেকে। ক্লান্ত পরমেশ্বরা যখন ঘুমাচ্ছিলেন গাছতলায়, তখন দেখতে পান একটা ছোট্ট হরিন (মাউস ডিয়ার) লাথি মেরে একটা তাগড়া কুকুরকে নদীতে ফেলে দেয়। এতে কিছুটা অবাক হন পরমেশ্বরা, ভাবেন এটা হয়তো কোন দৈব নির্দেশনা। তখন সিদ্ধান্ত নেন এই খানেই রাজ্যের সূচনা করবেন। আর যে গাছের নীচে তিনি শায়িত ছিলেন, তার নামে রাজ্যের নাম দেন মালাক্কা। ১৪০০ সালে তিনি একটা বেশ যুৎসই জায়গায় বন্দর স্থাপন করেন যেটা সারাবছর ধরে সুগম থাকায় খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। ১৪১৪ সালে পরমেশ্বরা ইসলাম গ্রহন করে নাম নেন রাজা ইস্কান্দার শাহ। ১৫১১ সালে মালাক্কায় পর্তুগীজরা ঘাঁটি গাড়ে, ১৫২৬এ সুলতান তাদের তাড়া খেয়ে পালিয়ে বাঁচেন। ১৬৪১ ওলন্দাজরা দখলে নেয় মালাক্কার যা টিকে থাকে ১৭৯৫ পর্যন্ত। এর পরে আসে ব্রিটিশরা।
সেন্ট পলস চার্চ, মালাক্কা
এপিটাফ, সেন্ট পলস চার্চ, মালাক্কা বলা হয়, "Melawat Melaka Bererti Melawati Malaysia" যার অর্থ "মালাক্কা দেখা মানে মালেশিয়া দেখা"! এর সত্যতা নিয়ে আমার হালকা সংশয় থাকলেও মালাক্কা দেখার জন্য মানুষের অভাব হয় না।
হোটেল পুরীতে পাখির বাসা (এর স্যূপ বিখ্যাত)
যাই হোক পরদিন সকালে উঠে আমি দৌড় দিলাম ফাইন দিতে আর মাশীদ গেল বাবা-নিয়োনইয়া মিউজিয়ামে। ঝামেলা শেষ হতেই বের হলাম Fort A Famosa দেখতে। ফোর্টের ফটক ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সেটা দেখে রওনা দিলাম সুলতানের প্রাসাদ দেখতে। কাঠের তৈরি এই প্রাসাদ এখন জাদুঘর। এই জাদুঘরটা বেশ ভালোই ছিল, অন্তত ইতিহাস কিছু জানা গেল । মালেশিয়া বীর হান তুয়া (Hang Tuah) আর হান জেবাত (Hang Jebat) এর গল্প জানতে খারাপ লাগলো না। যাদুঘরে প্রচুর ক্রিস (Kris) বা ছোরার সংগ্রহ ছিল। ক্রিস এর ফলা ঢেউ খেলানো, সাধারনত বিজোড় সংখ্যক ঢেউ থাকে এতে আর এই ঢেউ এর জন্মই ক্রিসকে কার্যকর মানুষ খুন করার অস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
বাবা-নিয়োনইয়া মিউজিয়াম, মালাক্কা
যাদুঘর থেকে বের হয়ে দাতারান পালোয়ানে খেতে গেলাম। ফুডকোর্ট এ সস্তায় খাওয়া যায়। মুস্কিল হল খাবার মুখে রুচবে কিনা। খেয়েদেয়ে বাড়ি পথে রওনা দিলাম, ধান্দা মাঝপথে মেলাকা জু দেখে ফেলা। চিড়িয়াখানা দেখার বুদ্ধিটা বেশী ভালো ছিল না। ঠা ঠা রোদা ক্লান্ত হয়ে কোন মতে পার্কিং লটে ফিরলাম। তারপর ১২০ তুলে ঠাই ঠাই করে বাড়ির পথে রওনা!
মালেশিয়াতে দেখার জায়গা প্রচুর, তবে কম খরচে কম সময়ে ভালো কিছু দেখতে হলে মালাক্কাকে তালিকার শুরু রাখাটা হবে বুদ্ধিমানের কাজ। এই সোমবার সাবা যাচ্ছি। শুনেছি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রেইনফরেস্ট আর বীচগুলোর কিছু আছে সেখানে। দেকা যাক কি হয়। আনটিল দেন...
১. ছোট বেলায় স্কুল শেষে বড়মামার বাড়িতে যেতাম, ডাল-ভাত খেয়ে অপেক্ষা করতাম কখন মা এসে বাড়ি নিয়ে যাবে। একবার মা এলেন, হাউমাউ কান্না। সাতবছরের শিশুর জন্য ঘটনাটা বিস্ময়ের, ভয়েরও। "ওরা গাড়ি হাইজ্যাক করেছে", আমার অসহায় মায়ের আহাজারি.. ভিসির বাসার সামনে মা'র ছাত্ররাই তাদের শিক্ষিকার গাড়ি ছিনতাই করেছেন। তখন বিপ্লবের সময়। হলুদ নাম্বার প্লেটের গাড়ি কব্জা করাটা রাজনৈতিক দর কষাকষির ভালো উপায় হতে পারে, জনৈক মধ্যবিত্ত শিক্ষকের লাভ-ক্ষতি মুখ্য হওয়া সঙ্গত নয়।
২. কারফিউ শব্দটার মানে যখন কেবল একটু বোঝা শুরু করেছি, তখন একটা দৃশ্য দেখে খুব মজা লেগেছিল। কাটাবন (এখন যেখানে বিদেশী মাছের বাজার) রেলগেটের রাস্তায় একজন কান ধরে ওঠাবসা করছেন, সমুখে অস্ত্র হাতে দেশ রক্ষার অতন্দ্র সৈনিক, জলপাই রঙা পোষাক তার। তখন খিলখিল করে হেসেছিলাম ভাইয়ার সাথে, আজকে আর হাসি পায় না।
৩. আজিজ মার্কেটে বাড়ি বাড়ি গিয়ে আজ ছাত্রদের পিটিয়ে জন্মের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে (সূত্র: বিবিসি বাংলা, অগাস্ট ২৩, প্রবাহ)। ওই বাড়িগুলোতে এক সময় থাকতাম আমরা। কেমন হতো আমার বুয়েট পড়ুয়া ভাইটাকে লাথি মারলে, ছাত্র হওয়াটাই যখন দোষ। আমি প্রাণপনে চিন্তাটা মাথা থেকে সরিয়ে দিতে চাই।
৪. ধানমন্ডি ২৭ নম্বর ফোর সিজনস জ্বলে পুড়ে শেষ। ১ নম্বরে পাশের বাসার চাচার গাড়িটাও ভাঙ্গা হল আরো দশটা গাড়ির সাথে। আমার বুড়ো বাবা যখন মনে প্রাণে নিরাপত্তা খোজেন, তখন আমি কারফিউ শুনে সস্তির নিঃশ্বাস ফেলি।
৫. বিপ্লব আসে সময়ের প্রয়োজনে। বিপ্লব বিলাস আসে অপ্রয়োজনে। আর অপবিপ্লব আসে স্বার্থের লোভে। আমরা মাঝে মাঝে নির্বোধের মতো ভুলে যাই কোনটা কি। আবেগ আর আবেগ বিলাস, সীমারেখাটা ভুলে গেলে বিপদ।
৬. ভালো লাগছে না.. হতে পারি "ব্লাডি মধ্যবিত্ত" কিংবা "ব্লাডি সিভিলিয়ান".. তারপরও ভালো লাগছে না
শুক্রবার গাড়িটা হাতে পেয়েছি। অনেকটা মাথা গরম করেই কেনা। গাড়ি হাতে পেয়েই ঘোরাঘুরি! আমি গাড়ি হাকানো মাচোম্যান ছিলাম না ঢাকায়। কেএল এসে খানিকটা ঠ্যালায় পড়েই (এবং ধার করে) কিনে ফেলা। অতি উৎসাহে দুদিনে দুশো তেইশ কিলো ড্রাইভ করে আজ প্রাণ যায় যায়। ঢাকায় কখনও হাইওয়ের এক্সিট খুঁজতে হয়না, এখানে সেটা মিস করলে মোটামুটি মালয়শিয়ার আরেক প্রান্তে চলে যাবার সম্ভাবনা প্রবল! পয়সার অভাবে জিপিএস কেনা হয়নি, সাইনপোস্টগুলোই ভরসা, যদিও মালয়শিয়ার সাইনপোস্টের বিশেষ সুনাম আছে বিভ্রান্ত করার বিষয়ে।
কথা ছিল লাল রঙ দেখে কিনবো, শেষে পেলাম অ্যাপল গ্রিন, কি আর করা, তাই সই!
এখানে রাস্তায় বেকুবের মতো কিছু করলে পেছন থেকে হংক করে, বেশী ক্ষেপলে গাড়ি কাছে এনে কটমট করে তাকায়, যেন পারলে ভস্ম করে ফেলে! গত দুদিন দুডজন বার হর্নের শব্দ শুনে নিজের উপর ভরসা করা বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। গেছিলাম দামানসারা, কিন্তু ফেরার রাস্তা জানিনা। মাসুদ ভাই বিশেষ স্নেহ করেন, তাই পেছন পেছন ফলো করে বাসায় পৌছে দিলেন, রাস্তা ভুল করলে হর্ন বাজান, আমি লেন বদলাই। শেষ পর্যন্ত বাসায় ফিরতে ফিরতে কালঘাম বের হয়ে গেল।
গাড়িতে ক্ল্যারিয়নের একটা সিডি প্লেয়ার আছে। গাড়ি কেনার উৎসাহে আমি প্রতিদিন গানের সিডি বার্ন করে যাচ্ছি। ফুয়াদের "নিটোল পায়ে" মুখস্থ হবার পথে।
লোকে বলে জীবনের প্রথম গাড়িটাকে নাকি সহজে ভোলা যায়না, যতই খারাপ আর ভাঙ্গাচোরাই হোক, অসংখ্য স্মৃতিময় দিনের সাক্ষী হয়ে থাকে সে। পার্ক করে লিফটের দিকে পা বাড়ানোর আগে গভীর মমতায় হাত রাখি ছাদে, এই দেশ ছাড়ার সময় একেও ছাড়তে হবে। নিষ্প্রাণ একটা যন্ত্রের জন্যেও আমরা কতো মায়াই না জমিয়ে রাখি বুকে..
মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু সচেতন অপমতদাতার পরিমান এতো হবে আশা করিনি।
তথ্যপ্রমানের কি এতোই অভাব ছিল? শুধু যুদ্ধের ছবিগুলোই কি যথেস্ট ছিল না হৃদয়ে সামান্য হলেও বোধ জাগানোর জন্য? নিজের স্বত্তা আবিস্কার করতে উৎসাহিত হবার জন্য? প্রচুর মানুষের জীবনের বদলে একটা দেশ পাওয়া। সেই মুক্তিযুদ্ধ হয়ে গেল গন্ডগোল। মানুষ মরল ৩০ লাখ, ৩৩ বছর পর সেটা হল ৩ লাখ, ৩ তিন দিন পর হল ৩ হাজার, সাথে ক্রুর উপহাস। কেউ "আসত" বোধ নিয়ে সাফাই গাইলেন নিয়ে চাঁদ-তারা আওয়ামের অখন্ডতার পক্ষে। লাল সবুজ পতাকায় গার্ড অব অনার নিল শেয়ালেরা। "অতীত নিয়ে পড়ে থাকা" গন্য হতে শুরু হল নির্বুদ্ধিতা রূপে।
জনৈক স্বাধীনতাবিরোধীর তনয় যখন লোকজনকে বেসবল ব্যাট দিয়ে পিটিয়ে মেরুদন্ড ভাঙ্গার ভয় দেখায় তখন শুরু হয় "সম্মিলিত বান্দর প্রতিরোধ আন্দোলন"।
হিমু প্রস্তাব করে, "আমি সক্কলের প্রতি করুণ নিবেদন করছি, আসেন, এই ফডুর সাথে খাপ খাইয়ে একটি গল্প, কিংবা প্রতিবেদন, আমরা লেখার চেষ্টা করি। কে শুরু করবে? অপু একটা ঠ্যালা দে ভাবের রেলগাড়িতে"
তারপর শুরু হয় পোস্টের প্লাবন। ব্রাত্য রাইসু স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ক্ষেপে গেলেন, "সম্মিলিত বান্দর প্রতিরোধ আন্দোলন" নিয়ে, জানালেন তার ক্ষোভ।
তখন রাসেল ভাই এর মন্তব্য, "বান্দর প্রজাতির পক্ষ থেকে পালটা অভিযোগ এসেছে, তাদের ছবি পোষ্টে প্রকাশ করাটা তাদের প্রতি চরম অবমাননা, তাদের মুখপত্র জানিয়েছেন, বান্দরের মতো শৃংখলাপরায়ন জাতি প্রতিবাদ হিসেবে আগামি কাল সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রতীকি অনশন করবে।পরবর্তি সংবাদেরজন্য চোখ রাখুন। আমরা জানা মাত্রই আপনাদের জানাবো"
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সময় প্রথম নিজের ঘর পাই। অদ্ভুত সেই ঘর। শীত গ্রীষ্ম, সারা বছর দিনের বেলা সে ঘরে থেকে মনে হতো আকাশ মেঘলা। পরবাসে এসে প্রথম দিকে ছিলাম এক সহকর্মীর বাড়ি। নানা কারনে আর থাকা হল না সেখানে। মামুন ভাই এর কল্যানে নিজের ফ্ল্যাটে উঠলাম। খালি ফ্ল্যাটের খালি তোষকে শুয়ে রাত পার করলাম, নিজের বাড়ি এই উত্তেজনায় ঘুম হল না। এগারোশো বর্গফুটের সেই আশ্রয়ে প্রায় পুরো সময়টাই কেটেছে নিঃসঙ্গ। টাইমজোনের কারনে বাড়ি ফিরি রাত একটা - দুটোয়। যখন সারা শহর ঘুমোয় আমি নিজের বাড়ি নিয়ে ব্যস্ত হই। রাধি, টিভি দেখার ব্যর্থ চেষ্টা। কখনও জুম লেনস দিয়ে রাস্তার ফুড কোর্টের ছবি তুলি। একলা ঘরের সাথে একলা জীবন। কখনও এঘর-ওঘর করে কাটে। এন্ডা রিগ্যালের কন্ডো ছেড়েছি গতমাসে। এখনকার আশ্রয় আরো ছোট, 586 বর্গফুট। সার্ভিস এপার্টমেন্ট, বেশী কিছু ভাবতে হয়না। চাইলে এনিয়ে গর্ব করাও যায়। তারপরেও 586 বর্গফুটের বন্দিশালায় হাসফাস করি। দীর্ঘশ্বাস ধাক্কা খায় সিলিং এ..। জীবনটা বড় জটিল হয়ে গেল...
শোহেইল ভাই এর উৎসাহে অনেকদূর আসা হল । আমাদের চিন্তার চৌবাচ্চার প্রতি তাই কিছুটা শ্রদ্ধা এই ছবিটা দিয়ে। রাইসু ভাই কে বিট করতে পারলাম না অবশ্য.. [পেইন্ট দিয়ে আকা মহা কঠিন]